কুমিল্লা বার্ড( BARD/মডেল) কি? কৃষি ক্ষেত্রে কুমিল্লা মডেলের বর্ণনা
প্রিয় পাঠক, কুমিল্লা মডেল কি? কৃষি ক্ষেত্রে কুমিল্লা মডেলের বর্ণনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে চাচ্ছেন, সঠিক বুঝতে পারতেছেন না কোথায় থেকে তথ্য সংগ্রহ করবেন? তাহলে এবার সঠিক জায়গায় এসেছেন। আপনার জন্য এ প্রতিবেদনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চলুন এবার প্রতিবেদনটি সম্পন্ন বোঝার চেষ্টা করি-
কুমিল্লা বার্ড/মডেল
বাংলা-পাক-ভারত উপমহাদেশে ১৯০৪ সালের সমবায় ঋণদান আইন পাশের মাধ্যমে সর্বপ্রথম সমবায় আন্দোলন শুরু হয়, কিন্তু সফলতা তেমন দেখা যায়নি। তারপর ১৯২৯ সালে এ আন্দোলন আবার চাঙ্গা হলে ৩০ দশকের সেই মহামন্দার কারণে তার থেমে যায়। পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর অর্থাৎ পাকিস্তান সৃষ্টির মাধ্যমে সমবায় আন্দোলন আবার জোরদার হয়ে ওঠে।
স্বাধীনতার পর পশ্চিম পাকিস্তানে গ্রাম উন্নয়ন তথা কৃষি ক্ষেত্রে উন্নয়ন আরম্ভ হলেও, তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশ ছিল অবহেলিত। ১৯৫৮ সালের জেনারেল আইয়ুব খান ক্ষমতায় এসে পূর্ব পাকিস্তান উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিলে একদল সমাজ বিজ্ঞানীর সহযোগিতায় কুমিল্লা সমবায় গড়ে তোলেন। এ সমবায় প্রতিষ্ঠান কুমিল্লার কোতোয়ালি থানায় ১০৭ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে গঠিত, যা কুমিল্লা মডেল হিসেবে বহুল পরিস্থিতি লাভ করেছে।
কুমিল্লায় মডেলটি স্থাপনের প্রেক্ষাপট
যেসব কারণে কুমিল্লা মডেলের যাত্রা শুরু হয় এবং মডেলটি কুমিল্লায় স্থাপন করা হয়, সে সমস্ত কারণগুলি নিম্নে উল্লেখ করা হলো-
- বৃহত্তর কুমিল্লা জেলার ম্যাজিস্ট্রেট ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের প্রিন্সিপাল হিসাবে খ্যাত ড. আক্তার হামিদ খান ছিলেন কুমিল্লার একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। তিনি দীর্ঘকাল যাবত কুমিল্লার মানুষের খুব কাছা কাছি থেকে তাদের আত্মসামাজিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে ও তার চিন্তা চেতনার ফসল হিসাবে এই মডেল প্রণয়ন করেন। সংগত কারণেই মডেলটি কুমিল্লায় অবস্থিত।
- তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান বিশেষ করে, বৃহত্তর কুমিল্লার জনসংখ্যা দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাওয়া সত্বেও কৃষি উৎপাদন ও খামারের আয়তন ছিল খুবই কম।
- কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে পল্লী উন্নয়নের বিভিন্ন কর্মকান্ডে গ্রাম্য প্রতিষ্ঠানসমূহ প্রায় অকার্যকর বা স্থবির হয়ে পড়েছিল।
- প্রতিবছর অতিবৃষ্টি ও অনাবৃষ্টিতে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি প্রায় প্রতিনিয়ত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং এক্ষেত্রে কৃষকদের সাহায্য সহযোগিতা করার মত কোন প্রতিষ্ঠান ছিল না।
- ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্বেও তাদের কোন নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ছিল না এবং তারা সবাই ধনী কৃষক তথা অধিক ভূমির মালিকদের দ্বারা শোষিত হচ্ছিল।
উল্লেখিত এসব কারণ ওই সময় বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল, কিন্তু উদ্যোক্তা ছিলেন একজন কুমিল্লার স্বনামধন্য ব্যক্তি। তিনি কুমিল্লা ও এর আশেপাশে সরাসরি প্রত্যাক্ষ করেছেন এবং কুমিল্লার ক্ষেত্রেই সেগুলো সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য ছিল বলে মনে করেছেন। তদুপরি, কুমিল্লা অধিক জনসংখ্যা বিশিষ্ট তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের একটি খাদ্য ঘাটতি এলাকা হিসাবেও বহুল পরিস্থিতি ছিল। এসব প্রেক্ষাপটেই মডেলটি কুমিল্লা জেলায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
কুমিল্লা বার্ড/মডেলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
কুমিল্লা মডেলের প্রধান লক্ষ্য ছিল কৃষি উন্নয়ন ও অন্যান্য অবকাঠামগত উন্নয়নের মধ্যে দিয়ে গ্রামীণ মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি সাধন, অর্থাৎ সার্বিক পল্লী উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা। এরই প্রেক্ষিতে কতগুলো উদ্দেশ্য সহায়ক হিসেবে কাজ করে যেগুলো নিম্নে আলোচনা করা হলো-
- কৃষকদের আয় ও সঞ্চয় বৃদ্ধির মাধ্যমে মূলধন সৃষ্টি করে গ্রামবাসীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা।
- মহাজনী, ঋণভার থেকে কৃষকদেরকে মুক্ত করে আত্মপ্রত্যায়ী ও সাবলম্বী করা।
- কৃষিকে আধুনিকীকরণের মাধ্যমে একর প্রতি উৎপাদন বৃদ্ধি করা।
- স্থায়ী সম্পদের সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রামবাসীদের জীবনে সমৃদ্ধি আনা।
- স্থানীয় নেতৃত্ব ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করা।
- যৌথ উৎপাদন পরিকল্পনা গ্রহণ ও সুষ্ঠু বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে গ্রামবাসী বা জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
- সমবায় খামার গঠনের মাধ্যমে জমির খন্ড-বিখন্ডতা দূরীকরণ করে যান্ত্রিক চাষাবাদ পদ্ধতির বিকাশ সাধন করা।
কুমিল্লা বার্ড/মডেলের প্রয়োগ
কুমিল্লা সমবায় ভিত্তিক মডেল বৃহত্তম কুমিল্লা জেলার কোতোয়ালি থানার একটি গবেষণার ফল। ১৯৫৯ সালে এর যাত্রা শুরু হলেও, তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপলাভ করে ১৯৬১সালে।সর্বপ্রথম এই মডেল কোতোয়ালি থানায় প্রয়োগ করা হয়। এখানে সফলতা লাভের পরবর্তী বছর কুমিল্লা জেলার আরো কয়েকটি থানায় এই মডেল প্রয়োগ করা হয়।
অতঃপর এ সফলতার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের আরো কয়েকটি থানাতে ব্যাপক ভিত্তিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য এই মডেলের কার্যক্রম চালু করা হয়। এসব থানা হচ্ছে বৃহত্তর রাজশাহী জেলার নাটোর, বৃহত্তর রংপুর জেলার গাইবান্ধা এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর। এখানকার ৩০ টি থানায় সম্প্রসারিত এ কার্যক্রমের সাফল্যের উপর নির্ভর করেই পরবর্তীতে ১৯৬৮ সালের মধ্যে কুমিল্লার সবকটি থানাকে এই কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
কৃষি ক্ষেত্রে উত্তরোত্তর সাফল্যের ফলশ্রুতিতে ১৯৭০ সালে সরকার কুমিল্লা মডেলকে একটি জাতীয় মডেল হিসেবে ঘোষণা দেয় এবং ১৯৭১ সালে সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প ( Integrated Rural Development Program- IRDP) নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। এ কর্মসূচির আওতায় ১৯৮২ সাল পর্যন্ত দেশের অন্যান্য জেলায় সম্প্রসারিত অব্যাহত থাকে।
এভাবে ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ সরকার কুমিল্লা বার্ড (BARD-Bangladesh Academy for Rural Development) কে বি আর ডি বি (BRDB-Bangladesh Rural Development Board) হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে দেশের সবগুলো থানাকে এ সমবায় কর্মসূচির অধীনে নিয়ে আসা হয়। প্রকৃতপক্ষে, বিআরডিবি (BRDB) হচ্ছে কুমিল্লা মডেলের একটি আদর্শরূপ, অর্থাৎ কুমিল্লা মডেলের কর্মধারায় বিআরডিবি এর মাধ্যমে পল্লী জনগণের মধ্যে সমাদৃত বা সম্প্রসারিত হচ্ছে।
কুমিল্লা বার্ড/মডেলের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও কার্যক্রম
কুমিল্লা মডেলের গঠন কাঠামো চারটি প্রধান স্তরে বিভক্ত। এগুলো নিম্নে আলোচনা করা হলো-
১। দ্বিস্তর বিশিষ্ট সমবায় সমিতি (Two-Tier Cooperative System- TTCS)
২। থানা প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন কেন্দ্র (Thana Training & Development Centre- TTDC)
৩। থানা পানি সেচ কর্মসূচি (Thana Irrigation Program- TIP) এবং
৪। গ্রামীণ বা পল্লী পূর্ত কর্মসূচি (Rural Works Program- RWP)
১। দ্বিস্তর বিশিষ্ট সমবায় সমিতি (Two-Tier Cooperative System- TTCS)
কুমিল্লা মডেলের অন্যতম প্রাতিষ্ঠানিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দ্বিস্তর বিশিষ্ট সমবায় ব্যবস্থা। এর প্রথম স্তরে গ্রাম ভিত্তিক কৃষক সমবায় সমিতি (KSS) এবং দ্বিতীয় স্তরে থানা কেন্দ্রিক সমবায় সংস্থা (TCCA)। সাধারণত গ্রামের আয়তন অনুসারে কমপক্ষে ১০ জন থেকে শুরু করে ২০-৩০ জন পর্যন্ত কৃষক নিয়ে KSS গঠিত হয়। কৃষকদের আয় ও উৎপাদন বৃদ্ধি করা এবং তাদেরকে সংগঠিত করে ঋণ বিতরণ ও কৃষি উন্নয়নে সমন্বিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা প্রাথমিক স্তরের মূল উদ্দেশ্য।
আবার দ্বিতীয় স্তরে সব ধরনের KSS নিয়ে TCCA গঠিত হয়। এই স্তরের বিভিন্ন কার্যক্রম ও উদ্দেশ্যসমূহের মধ্যে সঞ্চয় বৃদ্ধি, পুঁজি সংগ্রহ, শেষ ব্যবস্থা প্রবর্তন, আধুনিক কৃষিভিত্তিক প্রশিক্ষণ, উৎপাদনের সহযোগিতা প্রদান, কৃষি পণ্য বিপণন, প্রাতিষ্ঠানিক ঋণদান ও তদারকি প্রভৃতি অন্যতম। তবে, দ্বিস্তর বিশিষ্ট সমবায় পদ্ধতিতে প্রধানত উদ্দেশ্য রয়েছে দুইটি। যথা-
(I) সুদখোর, গ্রাম্য মহাজন ও পল্লী ব্যবসায়ী এবং জোরদারদের অর্থাৎ প্রভাবশালী ও ভূ-স্বামীদের শোষণের হাত থেকে গ্রামের সাধারণ জনগনকে রক্ষা করা এবং উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে তাদেরকে সাবলম্বী করে তোলা।
(II) ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের সংঘটিত করে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সম্পদ বিতরণ, ঋণ প্রদান, সঞ্চয় ও মূলধন গঠনের মাধ্যমে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তাদের সমন্বিত অংশকে নিশ্চিত করা।
২। থানা প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন কেন্দ্র (Thana Training & Development Centre- TTDC)
এ কর্মসূচিতে কৃষক এবং কৃষি কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দকে উন্নত কর্মকান্ডের জন্য প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কৃষি উপকরণ সরবরাহ করা হয়। এক্ষেত্রে সমন্বিত পল্লী উন্নয়নের স্বার্থে এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য সব ধরনের গঠনমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়ে থাকে। গ্রাম ভিত্তিক প্রাথমিক সমিতির কর্মকর্তাবৃন্দ সাপ্তাহিক প্রশিক্ষণে উপস্থিত হয়ে আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে এবং তারা ফিরে গিয়ে নিজেদের সাপ্তাহিক মিটিংএ সাধারণ কৃষক ও কৃষি শ্রমিকের মাঝে এই জ্ঞান বিতরণ করে। থানা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অফিসার ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। এর কর্মসূচির প্রধান উদ্দেশ্য দুইটি। যথা-
১। সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় পরিষদ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সেবা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করা।
২। গ্রামীণ জনগণের মধ্যে আধুনিক পদ্ধতিতে সব ধরনের চাষাবাদ উফশী বীজের ব্যবহারের মাধ্যমে অধিক উৎপাদন কার্যক্রম গ্রহণ করা।
৩। থানা পানি সেচ কর্মসূচি (Thana Irrigation Program- TIP)
সাধারণত এ কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে সেচ ব্যবস্থার উন্নতিকল্পে ও সেচ এলাকার সম্প্রসারণের প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। তাছাড়া পানি সেচের উন্নয়নের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করে কৃষকদের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন আনায়ন করা ও কর্মসূচির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। শুষ্ক মৌসুমে দেশের পর্যাপ্ত পানি সম্পদকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো।
কর্মসূচির অধীনে সংগঠিত কৃষকরা নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুর, দিঘী ও বিভিন্ন জলাশয় থেকে পাম্পের সাহায্যে এবং ভূগর্ভস্থ পানি গভীর ও অগভীর নলকূপের সাহায্যে উত্তোলন করে শুষ্ক মৌসুমের চাষাবাদ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে পেরেছে। সুতরাং এই মডেলের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো থানা পানি সেচ কর্মসূচি, যার মাধ্যমে গ্রামীণ মানুষের ফসল উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।
৪। গ্রামীণ বা পল্লী পূর্ত কর্মসূচি (Rural Works Program- RWP)
এ কর্মসূচির উদ্দেশ্য সমূহের মধ্যে গ্রামের বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন যেমন-রাস্তাঘাট, পুল ও কালভার্ট নির্মাণ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা জোরদার করা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ, বন্যা ও খরা থেকে ফসল রক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ ক্রমবর্ধমান উৎপাদিত, কৃষি পণ্যের বাজার সুনিশ্চিত করা প্রভৃতি অন্যতম। গ্রামের দরিদ্র জনগণের বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে ভূমিহীন দিনমজুরদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ডে জনগণের সম-অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রভৃতি ও এ কর্মসূচির সহায়ক। বর্তমানে থানা কাউন্সিল ও ইউনিয়ন পরিষদের আওতায় কাজের বিনিময়ে খাদ্য নামে এই কর্মসূচির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
কুমিল্লা বার্ড/মডেলের অন্যান্য কার্যক্রম
কুমিল্লা মডেল উপরে উল্লেখিত কার্যক্রম ছাড়াও আরো যেসব কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সেগুলোর মধ্যে যুব উন্নয়ন কর্মসূচি, গ্রাম্য শিশুদের উন্নত স্কুল শিক্ষা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পরিবার পরিকল্পনা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিষয়ক উন্নয়ন, বয়স্ক শিক্ষা কর্মসূচি, চরিত্র গঠন, নারী উন্নয়ন কর্মসূচি, পণ্যের গুদামজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ প্রভৃতি অন্যতম। এসব বিষয়ে কুমিল্লা মডেল অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে।
কুমিল্লা বার্ড/মডেলের সফলতা
কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে কুমিল্লা মডেল দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে। ফলশ্রুতিতে দেখা যায়, যেখানে কোতোয়ালী থানার লোকজন দুবেলা খেতে পারতো না, সেখানে মাত্র অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে সম্পূর্ণ থানাসহ আশে পাশের এলাকা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করার মাধ্যমে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে সক্ষম হল। সমগ্র দেশে এটা একটা বিপ্লবের মত সারা জাগালো। এর উল্লেখযোগ্য কিছু সফলতার দিকসমূহ নিচে তুলে ধরা হলো-
- কুমিল্লা মডেলের আওতায় ভূমির একর প্রতি উৎপাদন বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।
- কৃষি ক্ষেত্রে আধুনিকীকরণ ও যান্ত্রিকীকরণ অর্থাৎ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রবর্তন করা সম্ভব হয়েছে, যা কৃষিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে।
- ভূমিহীন দরিদ্র কৃষকদের কৃষি বিষয়ক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিয়ে, সমবায়ের মাধ্যমে সংগঠিত করে, তাদেরকে অধিক আত্মপ্রত্যাই ও সুসংহত হতে সহায়তা করেছে।
- বাধ্যতামূলক সঞ্চয় ও শেয়ার এর মাধ্যমে গ্রামীন দুর্বল অর্থনীতিতে মূলধন গঠনের ক্ষেত্রে এর সমবায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে।
- গ্রামীণ শিশুদের জন্য উন্নত স্কুল-শিক্ষা, অধিক বয়স বা বৃদ্ধদের জন্য বয়স্ক শিক্ষা এবং নারীদের জন্য কারিগরি শিক্ষা প্রসার ঘটিয়ে এই মডেল উল্লেখযোগ্য নজির সৃষ্টি করেছে।
- গ্রামীণ বৈষম্য দূরীকরণ, যুব ও নারী উন্নয়ন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, মা ও শিশুর পুষ্টি উন্নয়ন, কৃষি উপকরণ ও অন্যান্য বন্টন সমস্যা দূরীকরণ, বাজার মূল্য নিশ্চিতকরণে এই মডেল বেশ সুনাম অর্জন করে চলেছে।
সর্বোপরি গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন রাস্তাঘাট, পুল, কালভার্ট, খাল-খনন, বাঁধ নির্মাণ, পানি নিষ্কাশন প্রভৃতি জনকল্যাণমূলক কাজের মাধ্যমে বহু অসহায় দিনমজুরের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে কুমিল্লা মডেল গ্রাম উন্নয়নে এক নব দিগন্তের সূচনা করেছে।
কুমিল্লা বার্ড/মডেলের ব্যর্থতা বা সমালোচনা
কুমিল্লা মডেলের সফলতা হিসেবে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে এর সুদূর প্রসারী প্রভাব পরিলক্ষিত হলেও, সঠিক পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্তের অভাবে কিছু কর্মকান্ড ভেস্তে গেছে। ফলে সমালোচিত হয়েছে নানাভাবে। নিম্নে এ মডেলের কিছু ব্যর্থতা বা দোষ ত্রুটি সমূহ তুলে ধরা হলো-
- কুমিল্লা মডেল শুধুমাত্র কৃষির উন্নয়ন করতে সক্ষম হয়েছে-পল্লীর সার্বিক উন্নয়ন নয়। কারণ এক্ষেত্রে নারী উন্নয়ন, শিশু ও যুব উন্নয়ন, শিক্ষা ও অন্যান্য বিশেষ দিকগুলো অবহেলিত রয়ে গেছে।
- কৃষির আধুনিকীকরণ ও যান্ত্রিকীকরণে সরকার বিনামূল্যে বা ভর্তুকি মূল্যের ট্রাক্ট্রর, উফশী, বীজ, রাসায়নিক সার, সেচ যন্ত্র, কীটনাশক প্রভৃতি সরবরাহ করলেও দরিদ্র কৃষকদের সেগুলো কোন কাজে আসেনি। কারণ এসব সুযোগ-সুবিধা ধনী ও প্রভাবশালী কৃষকরাই বেশি ভোগ করেছে।
- কৃষক সংগঠনগুলো সাধারণ দরিদ্র কৃষকদের জন্য গঠন করা হলেও, ধনী কৃষকরায় তাদের তুলনাই বেশি সদস্যপদ গ্রহণ করেছে।
- থানা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে দরিদ্র কৃষকেরা ফলপ্রসু ভাবে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে পারেনি। কারণ আমলাদের নিজস্ব লোকবল ও আত্মীয়-স্বজনেরাই এক্ষেত্রে অধিক সুবিধা গ্রহণ করেছে।
- কোতোয়ালি থানার দিকে দৃষ্টিপাত করলেই কুমিল্লা মডেলের সীমাবদ্ধতার চিত্র ফুটে উঠে। কারণ বিগত প্রায় পাঁচ দশক যাবত কুমিল্লা একাডেমী চালু থাকলেও, কোতোয়ালি থানার কৃষক পরিবারের এক বিরাট অংশ এখনো সমবায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
- সাধারণত গ্রামবাসীদের অসচেতনতা দরুণ সমবায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে দুর্নীতি ও কর্তব্য অবহেলা এতই চরমে পৌছেছিল অর্থাৎ বেড়ে গিয়েছিল যে, যেসব উদ্দেশ্যে ঋণ দেওয়া হতো, সেগুলো ওই উদ্দেশ্যে বাস্তবায়নে ব্যবহৃত হচ্ছে কিনা তা তদারকি করা হতো না।
উপসংহার
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, সার্বিক কৃষি উন্নয়ন ও অন্যান্য অবকাঠামোতে উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রাম উন্নয়ন ও দরিদ্র বিমোচনে কুমিল্লা বার্ড/মডেল গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করা সত্ত্বেও সমালোচনা থেকে খালি নেই। তবে একথা সত্য যে, স্থানীয় নেতৃত্ব বিকাশের মাধ্যমে বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনে গতিশীলতা আনয়নে এই মডেলের ভূমিকা অনস্বীকার্য। দীর্ঘকাল যাবত বিভিন্ন কর্মকান্ডের সফলতার স্বীকৃতি স্বরূপ এ মডেল শেষ পর্যন্ত জাতীয় মডেলে পরিণত হয়ে দেশব্যাপী পল্লী উন্নয়ন বোর্ড BRDP গঠনে সহায়তা করেছে।
Hasi Online IT নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url