জীব বৈচিত্র্য কি? বাংলাদেশের জীব বৈচিত্রের সংরক্ষণের উপায় সমূহ
প্রিয় শিক্ষার্থী, জীব বৈচিত্র্য কি? বাংলাদেশের জীব বৈচিত্রের সংরক্ষণের উপায় সমূহ সম্পর্কে জানার জন্য বিভিন্ন বই-পুস্তক ও ওয়েবসাইট কাটাকাটি করছো, এই বিষয়ে মন মতো বা সঠিক এবং নির্বাচিত তথ্য পাচ্ছ না? তাহলে এবার সঠিক জায়গায় এসেছ। তোমার জন্য এই প্রতিবেদনটি অত্যন্ত প্রয়োজন। খুব মনোযোগের সহিত 'জীব বৈচিত্র্য কি? বাংলাদেশের জীব বৈচিত্রের সংরক্ষণের উপায় সমূহ' এই প্রতিবেদনটি পড়তে থাকো।
জীব বৈচিত্র্য (Biodiversity)
জীব বৈচিত্র্য শব্দটি ইংরেজি "biodiversity" থেকে এসেছে। এখানে Bio অর্থ জীব এবং diversity অর্থ বৈচিত্র্য। অর্থাৎ জিন, প্রজাতি ও বাসস্থান মিলেই জীব বৈচিত্র সৃষ্টি হয়। জীব বৈচিত্র্য বলতে জীবের উন্নত ও বৈচিত্র্য কে বোঝানো হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন পরিবেশে বিভিন্ন ধরনের জীব বৈচিত্র্য রয়েছে।
জীব বৈচিত্রের সংজ্ঞা (Biodiversity of Definitions)
জীব বৈচিত্র্য হলো পৃথিবীর সকল জীবের প্রজাতি, তাদের বৈশিষ্ট্য, এবং জীবনের বিভিন্ন পরিবেশের মধ্যে সম্পর্কের সমষ্টিগত চিত্র। এটি প্রজাতিগত বৈচিত্র্য, জিনগত বৈচিত্র্য, এবং বাস্তুতন্ত্র বৈচিত্র্যের মাধ্যমে জীবজগতের সঙ্কলিত রূপ প্রকাশ করে। জীব বৈচিত্র্য প্রাকৃতিক পরিবেশের স্বাস্থ্য ও স্থিতিশীলতার ভিত্তি গঠন করে এবং মানব জীবনের জন্য অপরিহার্য খাদ্য, ঔষধ ও অন্যান্য সম্পদের উৎস হিসেবে কাজ করে।
১৯৮২ সালে "International Union for the Conservation of Nature and Natural Resources (IUCN)" এর সম্মেলনে A. Wilcox জীব বৈচিত্র্যের যে সংজ্ঞা প্রদান করেন তা হল, "Biological diversity is the variety of life forms...at all levels of biological systems (molecular, organismic, population, species and ecosystem)" (অর্থাৎ জীবজগতের বিভিন্ন স্তর তথা জল স্থল ও বায়ুমন্ডলে জীবের বৈচিত্র্যতা প্রতিষ্ঠিত করাকে বোঝায়)।
জীব বৈচিত্র সংরক্ষণের উপায় (Conservation of Biodiversity)
২০০৬ সালে বিশ্ব প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংস্থা (IUCN) সারা বিশ্বে প্রায় ৪০% প্রজাতির লাল তালিকা প্রস্তুত করে, যাদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে। বাংলাদেশে অনেক প্রাণী বিলুপ্তির পথে। বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের পরিবেশ আজ বিপন্ন। বিশ্ব বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। উপকূলীয় এলাকায় অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি প্রবেশ করায় সেখানকার জীব বৈচিত্র্য চরমভাবে বিপন্ন হচ্ছে। সাধু পানির অনেক প্রজাতির মাছ আজ বিপন্ন বা বিলুপ্তির পথে। নিম্নে বাংলাদেশের জীব বৈচিত্র সংরক্ষণের উপায় সমূহ আলোচনা করা হলো-
১। বনভূমি সংরক্ষণ
বনভূমি বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। বিভিন্নভাবে বনভূমি ধ্বংস করা হচ্ছে। এতে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল হ্রাস পাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন বনভূমি সংরক্ষণের মাধ্যমে জীব বৈচিত্র্য রক্ষা করা যাবে। দেশের অনেক বনভূমির গাছ কেটে বনভূমি উজাড় করা হচ্ছে। এতে জীব বৈচিত্রের অনেক ক্ষতি হচ্ছে।
২। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হ্রাস
অতিরিক্ত জনসংখ্যার জন্য অতিরিক্ত খাদ্যের প্রয়োজন হয়। জনসংখ্যাকে খাদ্যের জন্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর উপর নির্ভর করতে হয়। সুতরাং জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার রোধ করলে পরিবেশ ভালো থাকবে এবং জীব বৈচিত্র সুরক্ষিত হবে।
৩। ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন রোধ
দেশের জনধ্যিকের দরুন কৃষি ভূমি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এতে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। আবার দেশের অনেক স্থানে ধান চাষের জমি জলাশয়ের রূপান্তর করে মাছ চাষ করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও বনভূমি নষ্ট করে বাড়ি-ঘর বা শিল্প-কারখানা তৈরি করা হচ্ছে। যার ফলে বাস্তসংস্থানের ক্ষতি হচ্ছে।
৪। পরিবেশ দূষণ বন্ধ করা
দেশের শিল্প উন্নয়ন ও কৃষির উন্নয়নের ফলে পরিবেশ দূষণের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হয়। যা অনেক প্রাণীর আবাসস্থল ও বংশবিস্তারের ক্ষেত্রে বিঘ্ন সৃষ্টি ক... করে। সুতরাং জীববৈচিত্র সংরক্ষণে পরিবেশ দূষণ বন্ধ করতে হবে।
৫। অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ বন্ধ করা
অতিরিক্ত খনিজ ও মৎস্য বা প্রাণীর সম্পদ আহরণের ফলে তারা বিলুপ্তি হচ্ছে। যেমন দেশে অনেক সাধুপণের মাছ এখন খুব কম দেখা যায়, এবং খনিজ সম্পদ দিন দিন কমে যাচ্ছে।
৬। জেনেটিক দূষণ বন্ধ করা
বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর জিন পরিবর্তন করে নতুন প্রজাতির উদ্ভব করা হচ্ছে। যার ফলে পরিবেশের ভারসাম্য এবং জীববৈচিত্র নষ্ট হচ্ছে। দেশে জিন দূষণের ফলে অনেক প্রজাতির ধানের জাত এখন বিলুপ্ত হয়েছে। সুতরাং জীববৈচিত্র সংরক্ষণে জিন দূষণ বন্ধ করতে হবে।
৭। বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি বন্ধ করা
বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে উদ্ভিদের বৈচিত্রের ওপর। একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় উদ্ভিদ তার বংশবিস্তার করতে পারে। কিন্তু তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তিত হয় যা জীববৈচিত্র বিঘ্নিত করে। সুতরাং জীববৈচিত্র সংরক্ষণের জন্য এবং পরিবেশ ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য উষ্ণতা বৃদ্ধি রোধ করতে হবে।
৮। পার্ক বা সংরক্ষিত বন তৈরি
দেশের বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ সংরক্ষণ করার নিমিত্তে বিভিন্ন পরিবেশে পার্ক বা সংরক্ষিত বন তৈরি করতে হবে। যেখানে বিলুপ্ত প্রায় উদ্ভিদ ও প্রাণী নিয়ে গবেষণা করে সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা ও গবেষণা করতে হবে।
৯। বন্যপ্রাণী ও পাখি শিকার বন্ধ
দেশের সব ধরনের বন্যপ্রাণী বিশেষ করে যে সকল প্রাণী প্রায় বিলুপ্তির পথে, সে সকল প্রাণীর শিকার বা হত্যা করা বন্ধ করতে হবে।
১০। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংরক্ষণের জন্য আইন তৈরি
দেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় আইন তৈরি করতে হবে। জীব বৈচিত্র সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে সরকার। একমাত্র দেশের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশ উন্নত করা সম্ভব, যা বৈচিত্র সংরক্ষণে ভূমিকা রাখবে।
১১। অভয়ারণ্য সৃষ্টি
দেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য অভয়ারণ্য সৃষ্টি করতে হবে। যাতে বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী বংশবিস্তার করতে পারে।
১২। সচেতনতা বৃদ্ধি
জনগণের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এনজিও এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের মাধ্যমে জীব ও বৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম ও কর্মশালা পরিচালনার মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি করে জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা সম্ভব।
১৩। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার
ভিন্ন ধরনের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান এবং তা সংরক্ষণের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে জীববৈচিত্র সংরক্ষণ করা যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি এবং ড্রোন ব্যবহার করে অভয়ারণ্যর নজরদারি করা যেতে পারে।
উপসংহার
জীববৈচিত্র্য আমাদের প্রকৃতি এবং সমাজের জন্য অপরিহার্য একটি বিষয়। এটি শুধুমাত্র পরিবেশের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না, বরং আমাদের বাস্তব জীবনের প্রতিটি দিককে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশের জীব বৈচিত্র সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী সমন্বিত প্রচেষ্টা। আমাদের সকলকে ব্যক্তি, সম্প্রদায় এবং সরকারকে একত্রিত হয়ে কাজ করতে হবে, যাতে আগামী প্রজন্মের জন্য আমাদের দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষিত থাকে এবং একটি টেকসই, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত হয়।
Hasi Online IT নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url