বাংলাদেশের অতিরিক্ত জনসংখ্যা সমস্যা বা আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপর প্রভাব

সুপ্রিয় পাঠক, বাংলাদেশের অতিরিক্ত জনসংখ্যা সমস্যা বা আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপর প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য জানার জন্য খুব আগ্রহী? তাহলে এই প্রতিবেদনটি আপনার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। কারণ এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অতিরিক্ত জনসংখ্যা সমস্যা এবং আর্থসামাজিক অবস্থার ওপর এর প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য আলোচনা করা হয়েছে। চলুন বিস্তারিত দেখে নিই-

বাংলাদেশের অতিরিক্ত জনসংখ্যা সমস্যা বা আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপর প্রভাব

বাংলাদেশের অতিরিক্ত জনসংখ্যা সমস্যা বা আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপর প্রভাব

বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দশটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ হল গণচীন। তবে জনসংখ্যার ঘনত্বের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান হলো প্রথম। এখানে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ১০৬২ জন লোক বাস করে। যারা দেশের উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। বাংলা দেশের অতিরিক্ত জনসংখ্যা এ দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার ওপর কি ধরনের প্রভাব ফেলেছে তা নিম্নের সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো-

১। উচ্চ জন্ম ও মৃত্যুহার

বাংলাদেশে হাজার প্রতি স্থুল মৃত্যুহার ও জন্মহার যথাক্রমে ৮ ও ২৮। ইউরোপে হাজার প্রতি স্থুল মৃত্যুহার ও জন্মহার যথাক্রমে ৭ ও ১০। আমাদের দেশে মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্য হারে কমলেও জন্মহার সেভাবে হ্রাস পায়নি। ফলে দেশে এখনো জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের কল্যাণ, মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দাতা গোষ্ঠীর সাহায্য সহযোগিতার কারণে দেশে মৃত্যুহার হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কার, শিক্ষার অভাব, দারিদ্রতা, বাল্যবিবাহ প্রভৃতি কারণে জন্মহার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়নি।

২। বেকারত্ব বৃদ্ধি

বর্তমানে বাংলাদেশের বেকার লোকের সংখ্যা প্রায় ১.৪০ কোটি অর্থাৎ দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৭.৭% লোক বেকার। অধিক জনসংখ্যার কারণে দেশে বেকার সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে এবং কৃষি জমি সহ প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ পড়েছে।

৩। নিম্ন মাথাপিছু আয়

দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে যদি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয় অর্থাৎ বেকার সমস্যার সৃষ্টি না হয় তবে দেশের জাতীয় আই জাতীয় আয় বা মাথাপিছু আয় এর উপর তেমন কোন প্রভাব পড়ে না। বেকারত্ব মানুষের মাথাপিছু আয়ের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে যা মানুষের নিম্ন জীবনযাত্রার অন্যতম কারণ।

৪। দারিদ্রতা

২০১১ সালের হিসাব অনুযায়ী দেশের ৩০% লোক এখনো দরিদ্র দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো দারিদ্রতা। গরিব মানুষ তাদের নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করার জন্য সন্তানদের ওপর নির্ভর করে। তারা সন্তানকে আয় রোজগারের একমাত্র উৎস হিসাবে দেখে। তারা মনে করে বৃদ্ধ বয়সে সন্তানরাই হলো একমাত্র অবলম্বন। সে কারণে দুই একটি সন্তানের উপর তারা ভরসা করতে পারে না। সুতরাং দেখা যায় দারিদ্রতা জনসংখ্যা বৃদ্ধির একটি কারণ, আবার অধিক জনসংখ্যা দারিদ্র্যতা জন্ম দেয়।

৫। প্রাকৃতিক বিপর্যয়

জনাধিক্য দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আবাসনের জন্য কৃষি জমিতে ঘরবাড়ি তৈরি করা হচ্ছে। দিন দিন বাগান, বিল, উন্মুক্ত জলাশয়, পতিত জমি প্রভৃতি হ্রাস পাচ্ছে। ফলে নষ্ট হচ্ছে জীব বৈচিত্র। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাস্তব্য প্রণালী। অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে শহরে পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। নগরবাসি তাদের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দেখা দিচ্ছে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক অশান্তি। অতিরিক্ত জনসংখ্যার কারণে প্রাকৃতিক ও সামাজিক উভয় পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেখা দিচ্ছে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়। বাংলাদেশে বিভিন্ন কারণে প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে। যেমন ঘন ঘন বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, মহামারী, জলবদ্ধতা, জলোচ্ছ্বাস প্রভৃতি।

৬। পুষ্টিহীনতা

দেশের যে সকল মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে তারা প্রতিদিন পরিমাণ মতো পুষ্টিকর খাবার খেতে পারে না। দেশের অনেক মানুষ এখনো অর্ধাহারে, অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। উন্নত দেশে মানুষ প্রতিদিন গড়ে ৩০০০ কিলো ক্যালরি খাদ্য গ্রহণ করে থাকে। আর আমাদের দেশে এই হার প্রতিদিন গড়ে ১৩০০ কিলো ক্যালোরি। তবে একজন মানুষের কমপক্ষে প্রতিদিন ১৮০০ থেকে ২১০০ কিলো ক্যালরি খাদ্য গ্রহণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আমাদের দেশে দারিদ্রতার কারণে প্রোটিন জাতীয় খাদ্য গ্রহণ করার হার ও কম।

৭। চাষযোগ্য জমির উপর প্রভাব

কোন দেশ কৃষি প্রধান হলে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলে সরাসরি তার প্রভাব কৃষি জমির উপর পড়ে। বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ এ দেশের অর্থনীতি কৃষি প্রধান। জনসংখ্যার বৃদ্ধির কারণে কৃষি জমি খন্ড খন্ড হয়ে যাচ্ছে। যে কারণে এখানে খামার পদ্ধতিতে জমি চাষ করা যাচ্ছে না, যার ফলে কৃষি উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে।

৮। জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি

২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ১০১৫ জন। অথচ সারা বিশ্বে জনসংখ্যার ঘনত্ব হল প্রতি বর্গমাইলে ১১৮ জন, সুতরাং দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে দেশে জনসংখ্যার ঘনত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে।

৯। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্য বৃদ্ধি

দেশের জনসংখ্যা যদি বোঝা হয়ে যায় তবে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের পক্ষে খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। আমদানি ও রপ্তানি ভারসাম্য রক্ষা করতে সরকার হিমশিম খায়। কোন পণ্য সামগ্রী আমদানি করতে বিলম্ব হলে বা দেশে উৎপাদন কম হলে তার প্রভাব ব্যাপকভাবে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। সুতরাং অধিক জনসংখ্যা শুধু দেশের বোঝা নয়, যে কোনো সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ ও বটে।

১০। সামাজিক অশান্তি

দেশে কাম্য জনসংখ্যা না থেকে জনাধিক্য হলে সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা বৃদ্ধি পায়। ফলে সামাজিক শান্তি বিনষ্ট হয়। সমাজে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি, লুটপাট, খুন, যখম, হত্যা, ধর্ষণ, সুদ, ঘুষ, কালোবাজারি, মোনাফেকারি, মাদকাসক্তি প্রভৃতি অপরাধমূলক কর্মকান্ড বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশ একটি অতিরিক্ত জনসংখ্যার দেশ। উক্ত অপরাধমূলক ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডগুলো প্রতিদিন এই দেশে অহরহ ঘটছে, যা আমরা বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়াতে দেখতে পাই।

১১। পরিবেশ দূষণ

জনাধিক্যের কারণে দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। মানুষ যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলে, অধিক ফসলের আশায় অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করে, মুক্ত স্থানে মলমূত্র ত্যাগ করে, বন জঙ্গল কেটে ঘর বাড়ি তৈরি করে প্রাকৃতিক পরিবেশ দূষিত করছে। কাজের খোঁজে মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে ভিড় জমাচ্ছে, ফলে গড়ে উঠছে অপরিকল্পিত নগরায়ন। নগর পিতা নাগরিক সুবিধা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি নগরের নগরবাসী নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে নাকাল ভাবে জীবন যাপন করছে।

১২। বিনিয়োগ হ্রাস

দেশে জনধিক্য হলে দেশের ভোগ ব্যয় বৃদ্ধি পায়। সরকার দেশের মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস তথা মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের দিকে বেশি মনোনিবেশ করে এবং জাতীয় আয়ের অধিকাংশ অর্থ আমদানি কাজে ব্যয় হয়ে যায়। ফলে সরকার দেশের বিভিন্ন ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে বা বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করতে পারে না। এতে সরকারের সঞ্চয় ও বিনিয়োগ কম হয়, ফলে দেশে সার্বিক উন্নয়ন ব্যাহত হয়।

১৩। রাজনৈতিক অস্থিরতা

সাধারণত বিশ্বের যে সকল দেশে জনধিক্য সেই সকল দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা যায়। যে দেশের সম্পদের তুলনায় জনসংখ্যা বেশি সেই সকল দেশে সারা বছরই অভাব অনটন লেগেই থাকে। অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাসস্থানের মত মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের সরকার কখনো কখনো ব্যর্থ হয়। এমন অবস্থায় ওই দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা একটি স্বাভাবিক ঘটনা। রাজনৈতিক অস্থিরতা আবার দেশের সার্বিক উন্নয়নের পথে বড় ধরনের প্রতিবন্ধক।

১৪। নিম্ন জীবন যাত্রার মান

দেশের জনসংখ্যা কাম্য স্তরে থাকলে মানুষের মাথাপিছু আয় তথা জীবন যাত্রার মান বৃদ্ধি পায়। দেশের উন্নতির ত্বরান্বিত হয়। আবার দেশের সম্পদের চেয়ে জনসংখ্যা বেশি হলে সম্পদের উপর চাপ পড়ে। মানুষের মাথাপিছু আয় কমে যায় এবং জীবনযাত্রার মান নিম্নমুখী হয়।

১৫। সরকারি সেবার মান হ্রাস

অতিরিক্ত জনসংখ্যা দেশের বোঝায় পরিণত হয়। দেশের আর্থসামাজিক তথা সুনাম উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন কাম্য জনসংখ্যা। অতিরিক্ত জনসংখ্যা দেশের বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রমের উপর চাপ সৃষ্টি করে। সরকার দেশের মানুষকে বিভিন্ন নাগরিক সুযোগ-সুবিধা দিতে হিমশিম খায়, যেমন-পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সেবা প্রভৃতি। বাংলাদেশের প্রতি বছর যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও হাজার হাজার ছেলে মেয়ে উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তারা ভালো কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারছে না। তাছাড়া শিশু ও গর্ভবতী মায়ের বিভিন্ন প্রতিষেধক টিকা, বিভিন্ন ভিটামিন সরবরাহ, শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ, বিদ্যুৎ, রাস্তাঘাট তৈরি প্রভৃতি সেবামূলক কার্যসম্পাদন করতে হিমশিম খাচ্ছে। যার ফলে ওই সকল সেবার মান হ্রাস পাচ্ছে।

১৬। গড় আয়ু কম

অধিক জনসংখ্যার কারণে সরকারের পক্ষে জনগণের জন্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত ডাক্তার ও নার্স নেই। অধিক দৈন্যতার তার কারণে মানুষ ভালো চিকিৎসা করতে পারে না। সুতরাং মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি জনসংখ্যার সমস্যা সমাধান করা একান্ত প্রয়োজন।

উপসংহার

আজকের এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অতিরিক্ত জনসংখ্যা সমস্যা বা আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপর প্রভাব সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। আশা করছি এ বিষয়ে পরিপূর্ণ ধারণা পেয়েছেন। এ সংক্রান্ত বিষয়ে যদি আরো নতুন কোন তথ্য পেতে চান, তবে কমেন্ট বক্সে জানিয়ে রাখবেন তাহলে নতুন তথ্য উপস্থাপন করে আপনাদেরকে সহযোগিতা করব ইনশাআল্লাহ। এতক্ষণ ধরে প্রতিবেদনটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

Hasi Online IT নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url