বাংলাদেশের উচ্চ জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির কারণ

বাংলাদেশের উচ্চ জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির কারণ

সাধারণত দেখা যায় উন্নত দেশে অপেক্ষা উন্নয়নশীল দেশে জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির হার অনেক বেশি। বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত দেশে জনসংখ্যার বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ১% এর নিচে। আবার অনেক উন্নত দেশের জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির হার নেতিবাচক অর্থাৎ ওই সকল দেশের জনসংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। যেমন- জাপান, সুইজারল্যান্ড, ডেনমার্ক প্রভৃতি দেশের কথা বলা যায়। যে সকল কারণে বাংলাদেশের উচ্চ জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির হার পরিলক্ষিত হয় তা নিম্নে আলোচনা করা হলো-

বাংলাদেশের উচ্চ জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির কারণ

১। বাল্যবিবাহ (Immature/Child Marriage)

বাংলাদেশ উচ্চ জন্মহারের অন্যতম কারণ হলো বাল্যবিবাহ। সাধারণত মহিলারা ৩৯ বছর পর্যন্ত গর্ভে সন্তান ধারণ করতে পারে। যেসব মেয়েদের ১৬ বছরের পূর্বে বিবাহ হয় তাদের সন্তান সংখ্যা বেশি। এর কারণ হলো কম বয়সে বিবাহ করলে মেয়েরা সন্তান ধারণের সময় বেশি পায়। যেসব মেয়েদের বিবাহ ২৫ বছরের পরে হয় তাদের সন্তান সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকে।

২। উচ্চ শিশু মৃত্যুহার (High Infant Mortality)

বাংলাদেশের উচ্চ শিশু মৃত্যুহার বর্তমান থাকায় পিতা-মাতারা কম সন্তান নিয়ে ভরসা করতে পারে না, যে তাদের সন্তান বেঁচে থাকবে। সে কারণে অনেক দাম্পত্যি দুইয়ের অধিক সন্তান নিয়ে থাকেন। এ কারণে উচ্চ জন্মহার পরিলক্ষিত হয়।

৩। জন্ম নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি সম্পর্কে অজ্ঞ (Lack to use of Contraceptives)

সামাজিক কারণে বাংলাদেশের অনেক ছেলে-মেয়ে যৌন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। মাসের কোন সময় স্ত্রী সন্তান ধারণ করবে সেটা অনেক দম্পতি অজ্ঞ থাকে। আবার জন্ম নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন উপকরণ ক্রয়ে অনেক দম্পতির চরম লজ্জা পায়। এ সকল নানাবিদ কারণে বাংলাদেশে উচ্চ জন্মহার বিরাজমান।

৪। পারিবারিক সুদৃঢ় বন্ধন (Strong Family Contact)

উন্নত দেশ গুলোতে চুক্তি বিবাহ বেশি হয়। স্বামী স্ত্রী যেকোনো সময় একজন অন্যজনকে ছেড়ে যেতে পারে। যেহেতু একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ছেলেমেয়েরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়, সেহেতু উক্ত দম্পতির সন্তান নেওয়ার প্রবণতা কম থাকে। বাংলাদেশের হিন্দু সমাজে তালাক প্রথা নেই বললেই চলে। আর মুসলিম সমাজে এই প্রথা চালু থাকলেও এর প্রয়োগ খুব সামান্য। সুতরাং পারিবারিক সুদৃঢ় বন্ধন উচ্চ জন্মহারের কারণ।

৫। মহিলাদের মতামত অপেক্ষিত (Ignoring Female Opinion)

আমাদের পুরুষ শাসিত সমাজে যে কোন বিষয়ে সবসময় মহিলাদের মতামত অপেক্ষিত হয়। সন্তান নেওয়া না নেওয়া পুরুষের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। অনেক সময় স্ত্রী সন্তান নেওয়ার ইচ্ছা না থাকলেও স্বামী তার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়।

৬। নারী শিক্ষার হার কম (Low Female Education Rate)

সুশিক্ষায় শিক্ষিত মায়েরা জীবন সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন। শিক্ষিত মা জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ সময় লেখাপড়ার কারণে অবিবাহিত জীবন যাপন করে। লেখাপড়া শেষে শিক্ষিত মায়েরা চাকরি করেন। সুতরাং দেখা যায় শিক্ষিত মায়েদের সন্তান কম থাকে। বাংলাদেশের শিক্ষিত মায়ের সংখ্যা খুবই কম। যে কারণে উউচ্চ জন্মহার বিরাজমান।

৭। ধর্মীয় কুসংস্কার (Rough Interpretation of Religion)

বাংলাদেশের প্রায় ৮৮ শতাংশ লোক মুসলমান। মুসলিম সমাজে একটি ধারণা প্রচলিত ছিল যে, মহিলাদের পেটে যত বাচ্চা আছে সব নিতে হব্‌ হবে, না নিলে গুনাহ হবে। তারা আরো বিশ্বাস করত যে, মুখ দিয়েছেন যিনি আহার দিবেন তিনি। এই বিশ্বাসের কারণে বাংলাদেশের উচ্চ জন্মহার বিরাজমান।

৮। শিক্ষার হার কম (Low Education Rate)

বাংলাদেশের শিক্ষার হার মাত্র ৫৬ %। এর মধ্যে পুরুষ ৫৮% আর মহিলা ৫৩ %। শহর এলাকায় শিক্ষিতর হার প্রায় ৭০%। এখানে পুরুষ ৭২ % আর মহিলা প্রায় ৬৭%। সুশিক্ষায় শিক্ষিত পিতা-মাতা তাদের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ জীবন সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন থাকে। সে কারণে শিক্ষিত পিতা-মাতা জন্ম নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন পদ্ধতি গ্রহণ করে পরিবার ছোট রাখার ব্যবস্থা করে। আর অশিক্ষিত লোকেরা জীবন সম্পর্কে উদাসীন থাকার কারণে তারা পরিবার ছোট রাখার চিন্তাভাবনা কম করে।

৯। কৃষি প্রধান অর্থনীতি (Agricultural Base Economy)

বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ। এদেশে প্রায় ৮০ % লোক প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িত। কৃষি পরিবারগুলো সাধারণত বেশি সন্তান নিতে আগ্রহী হয়, কারণ কৃষি কাজের জন্য অনেক কাজের লোকের প্রয়োজন হয়। নিজের ছেলের সংখ্যা বেশি হলে মজুরি হ্রাস পাবে এই আশায় একাধিক ছেলে সন্তান না হওয়া পর্যন্ত সন্তান জন্মদানে আগ্রহী থাকে। বাংলাদেশে উচ্চ জন্ম হারের এটি একটি অন্যতম কারণ।

১০। মাথাপিছু আয় (Per-head Income)

বাংলাদেশে এখনো প্রায় ৪০ % লোক দরিদ্র সীমার নিচে বাস করে। সংসারে অভাবনটন লেগে থাকায় এইসব গরীব দুঃখী মানুষ আয় রোজগার বৃদ্ধির লক্ষ্যে বেশি সন্তান নিতে আগ্রহী হয়। গরিব লোকেরা নিজের সন্তানদের কে সম্পত্তি মনে করে। এদেশে উচ্চ জন্মহারের এটি একটি অন্যতম কারণ।

১১। নির্ভরশীলতার হার বেশি (Dependency Ratio)

যে দেশের নির্ভরশীলতার হার যত বেশি সে দেশে জন্মহার তত বেশি। বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় বৃদ্ধ বয়সে পিতামাতাকে তাদের ভরণপোষণের জন্য সন্তানের আয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়। বৃদ্ধ বয়সে পিতা-মাতার সন্তান হল একমাত্র সম্বল। এ দেশে এখনো শিশু শ্রম বিদ্যমান আছে। সুতরাং সন্তানদের লেখাপড়া না শিখিয়ে কোনভাবে একটু বড় করতে পারলেই উপার্জন কম হয়। সুতরাং বলা যায় যে, নির্ভরশীলতার কারণে উচ্চ জন্মহার বিদ্যমান রয়েছে।

১২। মহিলাদের কর্মসংস্থানের অভাব (Lack of Woman Employment)

দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৮ % মহিলা। তবে তাদের দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ খুবই কম। চাকরিজীবী মহিলাদের সন্তান কম থাকে। এর কারণ হলো মহিলাদের মাতৃত্বকালীন ছুটিসহ অন্যান্য সমস্যার কারণে বেশি সন্তান নিতে আগ্রহী হয় না। অন্যদিকে বেকার মহিলাদের এই সমস্যার না থাকাই উচ্চ জন্মহার বিরাজ করছে।

১৩। বহু বিবাহ (Polygamy)

আমাদের দেশের সামাজিক ও মুসলিম ধর্মীয় নিয়মে একজন পুরুষ একসাথে একাধিক স্ত্রী রাখতে পারে। একজন পুরুষের একাধিক স্ত্রী থাকলে ওই পরিবারে স্ত্রীদের মধ্যে সন্তান জন্মদানের একটি প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এর কারণ হলো বড় বউ এর যদি তিন সন্তান থাকে তবে ছোট বউ এর তিনটি সন্তান না থাকলে স্বামীর মৃত্যুর পর সম্পত্তির ভাগ কম পাবে। সুতরাং বহু বিবাহ উচ্চ জন্ম হারের একটি অন্যতম কারণ।

১৪। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাব (Unrest Political Condition and Lack of proper plan)

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার চরম অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। সরকার বদলের সাথে সাথে নীতির ও পরিবর্তন হয়। পূর্বের সরকার কর্তৃক গৃহীত জনসংখ্যা নীতি বা জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হ্রাস কল্পে গৃহীত পদক্ষেপসমূহ বাস্তবায়নে পরবর্তী সরকার আন্তরিক নাও হতে পারে। কারণ সব রাজনৈতিক দল বা জোট সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি এক হয় না। বাংলাদেশে দেখা গেছে, সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে জন্মনিয়ন্ত্রণের উপকরণসমূহ আমদানি ও সরবরাহ করার ক্ষেত্রে কোন সরকার একেবারে উদাসীন আবার কোন সরকার বেশ যত্নশীল।

১৫। নিম্নমানের জীবনযাত্রা (Low living Status)

বাংলাদেশের গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং শহরের বস্তি এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মান খুবই নিম্নমানের। এইসব পরিবারের সন্তান লালন পালন করার জন্য তেমন একটা অর্থ ব্যয় হয় না। এ ধরনের পরিবারে প্রায় ছয়-সাত বছর বয়স পর্যন্ত ছেলেমেয়েদের কোন কাপড়-চোপড় পড়াতে হয় না এবং বুকের দুধ ছাড়া বাড়তি কোনো খাবারের তেমন প্রয়োজন হয় না। সুতরাং সন্তান লালন-পালন করা কম খরচ হওয়াই এখানে উচ্চ জন্মহার পরিলক্ষিত হয়।

১৬। জন্ম নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি গ্রহণে অনীহা (Ignore to use to Birth Controling Tools)

বিবাহিত সক্ষম মহিলারা প্রতিবছর সন্তান প্রসব করবে এটা বাংলাদেশের সমাজে একটি অত্যান্ত স্বাভাবিক ঘটনা। সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কারের কারণে আমাদের দেশের মহিলারা জন্মনিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন পদ্ধতি বা স্থায়ী পদ্ধতি গ্রহণ করতে চাই না। মায়েরা প্রতিবছর সন্তান জন্ম দিতে লজ্জা পাই না অথচ জন্ম নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি গ্রহণ করতে মারাত্মক লজ্জা পাই। কারণ জন্মনিয়ন্ত্রণ কারিনীকে বিভিন্ন অপবাদ দেওয়া হয়। কলঙ্ক ও অপবাদের ভয়ে মহিলারা জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করে। উচ্চ জন্মহারের এটিও একটি অন্যতম কারণ।

১৭। ভিক্ষাবৃত্তির কারণ (Oportunity of Begging)

বাংলাদেশে পর্যাপ্ত ভিক্ষার সুযোগ রয়েছে। ভিক্ষা করলে আয় রোজগার কম হয় না। ঢাকা শহরে বসবাসরত মোট জনসংখ্যা প্রায় ১২% লোক ভিক্ষাবৃত্তির সাথে জড়িত। গ্রামের গরীব দুখী অনেক মানুষ ভিক্ষাকে পেশা হিসেবে নিয়েছে। এইসব পেশার লোকেরা বেশি সন্তান নিতে আগ্রহী হয়। কারণ ছেলে মেয়ে বেশি হলে ভিক্ষাবৃত্তির সাথে সম্পৃক্ত করলে আয় রোজগার বেশি হয়। যার ফলে বাংলাদেশে উচ্চ জন্মহার বিরাজ করছে।

উপসংহার

আমার আজকের এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের উচ্চ জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির কারণ সমূহ বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করেছি, আশা করছি এ বিষয়ে সঠিক এবং পরিপূর্ণ তথ্য বুঝতে পেরেছেন। এ ধরনের যদি কোন বিষয়ে আপনি জানতে আগ্রহী হন তাহলে কমেন্ট বক্সে জানিয়ে রাখবেন, তাহলে আপনাদের জন্য নতুন নতুন তথ্য উপস্থাপন করার উৎসাহ বৃদ্ধি পাবে। এতক্ষণ ধরে আমার এই প্রতিবেদন টি পড়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

Hasi Online IT নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url