বাংলাদেশের কৃষির বৈশিষ্ট্য এবং অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব

বাংলাদেশের কৃষির বৈশিষ্ট্য এবং অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব সম্পর্কে সঠিক ও পরিপূর্ণ ধারণা অর্জনের জন্য আপনি চিন্তিত রয়েছেন, এই বিষয়ে পরিপূর্ণ জানার জন্য চিন্তিত রয়েছেন? তাহলে এবার আপনি সঠিক জায়গায় এসেছেন। আপনার জন্য এই প্রতিবেদনটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের কৃষির বৈশিষ্ট্য এবং অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব

বাংলাদেশের কৃষির বৈশিষ্ট্য এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব সম্পর্কিত আজকের এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কৃষির বৈশিষ্ট্য এবং অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব সহ আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আলোচনা করা হয়েছে। চলুন বিস্তারিত দেখে নিই।

ভূমিকা

বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ। বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে চলেছে। বিশ্বের যে কোন দেশের তুলনায় বাংলাদেশের মাটি ও জলবায়ু কৃষি কাজের উপযোগী বিধায় এখানে কৃষি একটি উৎকৃষ্ট অবলম্বন। আমরা যদি বাংলাদেশের কৃষির অতীত ইতিহাস লক্ষ্য করি তবে দেখতে পাবো যে, বাঙ্গালীদের একটি প্রবাদ আছে যা তার ঐতিহ্যের কথা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে "ভাতে মাছে বাঙালি" অর্থাৎ ভাতের সাথে মাছ আছে। আরো শোনা যায় যে, "গোয়াল ভরা গরু", "পুকুর ভরা মাছ" এবং "গোলা ভারা ধান"। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, প্রাক ঐতিহাসিক যুগে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের সবুজ ঘেরা পাহাড়ি এলাকায় স্থায়ী বসতির সৃষ্টি করে। ধারণা করা হয় যে, তখন থেকেই বাংলাদেশে কৃষির উদ্ভব ঘটেছে।

বাংলাদেশের কৃষির বৈশিষ্ট্য

বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান স্বাধীন রাষ্ট্র। দেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৮০% লোক সরাসরি ও পরোক্ষভাবে কৃষি কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। ২০১০ সালের হিসাব অনুযায়ী দেশের মোট জাতীয় আয়ের ১৮.৬% কৃষি থেকে আসে। দেশের মোট শ্রমিকের ৪০% কৃষি কাজে নিয়োজিত রয়েছে। দেশের প্রচুর শ্রমিক, উর্বর কৃষিজমি, সেচ ব্যবস্থা, পানি ও মৃত্তিকার লবণাক্ততা, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জমির প্লট প্রভৃতি কারণে কৃষি ক্ষেত্রে এখন ব্যাপক উন্নতি হয়নি। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের কৃষি ক্ষেত্রে পূর্বের চেয়ে বেশ অগ্রগতির সাধিত হয়েছে। দেশে কৃষি প্রযুক্তি বৃদ্ধির সাথে সাথে আগামীতে আরও পরিবর্তন আসবে বলে ধারণা করা হয়। বাংলাদেশের কৃষির বৈশিষ্ট্য গুলি নিম্নে উল্লেখ করা হলো।

১। সনাতন পদ্ধতির চাষাবাদ

বাংলাদেশে এখনো প্রাচীন পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা হয়। তবে আসার কথা হচ্ছে যে, এ অবস্থা দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। এখন কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার করা হচ্ছে।

২। শাকসবজিতে ব্যাপক কীটনাশক প্রয়োগ

অনেক কৃষক কীটপতঙ্গ দমন বা অধিক লাভের আশায় অতিমাত্রায় বিভিন্ন কীটনাশক ও রাসায়নিক উপাদান প্রয়োগ করে, যা মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর। বাজারের শাকসবজিতে এমন প্রমাণ পাওয়ায় ক্রেতাগণ আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

৩। সেচের জন্য প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল

কৃষি জমিতে সময়মতো সেচ না দিলে ফলন ভালো হয় না। বিদ্যুৎ সময় মত না থাকা, সেচ যন্ত্রনষ্ট, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, আর্থিক সংকট প্রভৃতি কারণে অনেক কৃষক সেচের জন্য প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে। এর ফলে ফলন কম হয় এবং কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

৪। কৃষি জমির উপর চাপ

বাংলাদেশ একটি অধিক জনসংখ্যার দেশ। এই বিপুল জনসংখ্যার খাদ্যের যোগান দিতে গিয়ে কৃষি জমির উপর চাপ পড়েছে। জমিতে একটি ফসল চাষ করার পর বিরতি না দিয়ে আবার অন্য ফসল চাষ করা হচ্ছে। এতে অনেক সময় ফসল ভালো হয় না।

৫। কম উৎপাদন

ভালো জাতের বীজ, সার ও কীটনাশক সংকট, সময়মতো সেচ না দিতে পারা প্রভৃতি কারণে কৃষি উৎপাদন কম হয়।

৬। ভূমিহীন কৃষক

বাংলাদেশে ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা অত্যাধিক। যারা প্রকৃত কৃষক তাদের কৃষি জমি থাকা উচিত। কিন্তু দেশে অনেক ব্যবসায়ী বা অন্যান্য পেশার মানুষ আছে যারা কৃষি জমির মালিক।

৭। জলাবদ্ধতা

বাংলাদেশের উপকূলীয় অনেক জেলা আছে যেখানে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। যার ফলে লক্ষ লক্ষ হেক্টর জমি অনাবাদি থেকে যায় অথবা জলবদ্ধতার কারণে ফসল নষ্ট হয়ে যায়।

৮। লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে সাইক্লোন, চিংড়ি চাষ, সমুদ্র সমতল পরিবর্তন প্রভৃতি কারণে কৃষি জমিতে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করছে। লবণাক্ত পানি কৃষি জমির উর্বরতা হ্রাস করে।

৯। সার, বীজ ও কীটনাশক সংকট

দেশে বিভিন্ন সময় কৃষি উপকরণ যেমন সার, বীজ ও কীটনাশক সংকট দেখা দেয়। এই সংকটের কারণে ফসল উৎপাদন কম হয়।

১০। জীবন ধারণের জন্য চাষ

বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষক তাদের নিজেদের পরিবারের চাহিদা মেটানোর জন্য চাষাবাদ করে থাকে। অতিরিক্ত ফসল উৎপাদন করে বিক্রি করার মানসিকতা তাদের কম।

১১। কৃষি শ্রমিকের অজ্ঞতা

দেশের গ্রামীণ অঞ্চলে শিক্ষিতের হার কম। বিধায় আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি তারা আয়ত্ত করতে পারে না। অনেক কৃষিশ্রমিক আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে পারে না।

১২। নিম্নমানের শস্যের জাত

দেশে অনেক ফসল চাষ করা হয় যেগুলির জাত নিম্নমানের। অনেক ফসলের উচ্চ ফলনশীল জাত এখনো কৃষকের হাতে আসেনি।

১৩। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কৃষি জমি

সাধারণত পিতার মৃত্যুর পর জমির মালিক হয় তাদের সন্তানেরা। যে পরিবারে অধিক সন্তান থাকে সে পরিবারে কৃষি জমিগুলো খন্ড খন্ড হয়ে যায়। এই সকল জমি আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা যায় না।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব

কৃষি প্রধান বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব অপরিসীম। দেশের প্রায় ৮০% লোক সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কৃষির সাথে জড়িত। দেশের মোট শ্রমিকের প্রায় ৪০% কৃষি কাজ করে। দেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো কৃষি। দেশের মোট জাতীয় আয়ের সিংহভাগ আসে কৃষি ও কৃষিজাত দ্রব্য থেকে। বাংলা দেশের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব আলোচনা করা হলো-

১। দেশের খাদ্যের চাহিদা পূরণ

বর্তমানে দেশ প্রায় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ তা অর্জন করেছে। দেশের খাদ্যের চাহিদা প্রায় ৯০% কৃষি থেকে আসে। বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য আমদানি করতে হলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হত।

২। শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ

দেশে উৎপাদিত ফসলের উপর ভিত্তি করে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। যেমন- পাট, চা, চিনি প্রভৃতি শিল্প।

৩। গৃহস্থালির জ্বালানি সরবরাহ

কৃষি থেকে প্রাপ্ত খড়, পাট খড়ি, লতাপাতা প্রভৃতি গ্রামীণ এলাকার জ্বালানির প্রধান উৎস। । যার ফলে গ্যাস, বিদ্যুৎ, কেরোসিন প্রভৃতি শক্তি সম্পদ সাশ্রয় হয়।

৪। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন

দেশে উৎপাদিত কৃষিকাজ দ্রব্য বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়। যেমন- পাট ও পাট জাত দ্রব্য, চা, তামাক প্রভৃতি।

৫। কর্মসংস্থান সৃষ্টি

বিশাল জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ কৃষি কাজের সাথে জড়িত আবার উৎপাদিত কৃষিজাত দ্রব্য ক্রয় বিক্রয়ের মাধ্যমে অনেক লোকের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়। কৃষিতে কর্মের সুযোগ না থাকলে দেশে বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতো।

৬। রাজস্ব আয়ের উৎস

সরকারের আয়ের প্রধান একটি উৎস হলো কৃষি। কৃষিজমি, কৃষি পণ্য, কৃষি বাজার প্রভৃতি খাত থেকে কর বা রাজস্ব আয় করে থাকে।

৭। ক্ষমতা বৃদ্ধি

কৃষি উন্নতি হলে কৃষকের উন্নতি হবে। দেশের মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। দেশের শিল্প জাতীয় দ্রব্যের বাজার সৃষ্টিতে কৃষির ভূমিকা অপরিসীম।

৮। বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতি নিরসন

দেশে উৎপাদিত কৃষিজাত দ্রব্য বিদেশে রপ্তানি করে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতি দূর করা যায়।

৯। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার

বাংলাদেশের ব্যবসা বাণিজ্যের মূল ভিত্তি হলো কৃষি। কৃষি উৎপাদন যত বেশি হবে তত ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। বাংলাদেশের সর্বত্র সব ধরনের ফসল বা ফলমূল উৎপাদন হয় না। এক অঞ্চলের শাকসবজি ও ফলমূল অন্য অঞ্চলে সরবরাহ তথা ব্যবসা করে অনেক লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

১০। শিল্প উন্নয়নের ভিত্তি

একটি দেশকে শিল্প উন্নত হতে হলে অবশ্যই শিল্পের কাঁচামাল যোগান থাকতে হবে। কৃষিভিত্তিক শিল্পের কাঁচামাল কৃষি থেকে আসে। অর্থাৎ দেশকে শিল্প উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভূমিকা অপরিসীম।

১১। জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন

দেশের অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র কৃষক। যারা গ্রামীণ পরিবেশে বাস করে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কৃষির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১২। জাতীয় আয় বৃদ্ধি

দেশে কৃষি উৎপাদন যত বৃদ্ধি পাবে, দেশের জাতীয় আয় ও তত বৃদ্ধি পাবে। ফলে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাধিত হবে।

উপসংহার

আমি আজকের এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কৃষির বৈশিষ্ট্য এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব সমূহ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। আশা করছি এই বিষয়ে পরিপূর্ণ ধারণা পেয়েছেন। এই প্রতিবেদনটি যদি আপনাকে ভালো লাগে তাহলে ফেসবুক অথবা অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করবেন যাতে অন্যরাও এ বিষয়ে পরিপূর্ণ ধারণা পেতে পারে। এতক্ষণ ধরে আমার এই প্রতিবেদনটি পড়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

Hasi Online IT নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url